Peary Chand Mitra

টেকচাঁদ ঠাকুর


সময়টা ১৮ শতকের মাঝামাঝি। তখনকার কলকাতার সুশীল সমাজ, একদিকে যেমন কালের হাওয়ায় সাহেবদের বিলেতি হালের বাতাস গায়ে লাগিয়ে পালের তরী এগিয়ে নিচ্ছেন, অন্যদিকে তেমনি অশিক্ষা, কুসংস্কার আর অসংলগ্ন জীবন যাপন তাদেরকে এক প্রকৃত অন্ধকারের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল।

এমন সময়ে,আত্মপ্রকাশ ঘটে বাংলার নবজাগরণের অন্যতম নেতা প্যারীচাঁদ মিত্রের। ছদ্মনাম ‘টেকচাঁদ ঠাকুর’। জন্ম হয়েছিল ১৮১৪ সালের ২২শে জুলাই, কলকাতার এক ধনী পরিবারে। পিতার নাম রামনারায়ন মিত্র।

সেই সময়ের শীর্ষস্থানীয় লেখক ও সমাজ সংস্কারক ছিলেন প্যারিচাঁদ মিত্র। তাঁর  সাহিত্য চর্চা ছিল বহুমাত্রিক ও যুগোপযোগী।  তিনি বাংলাভাষার প্রথম উপন্যাস ‘আলালের ঘরের দুলাল’ এর রচয়িতা।

প্যারিচাঁদ শিশুকাল থেকেই ছিলেন মেধাবী। একইসাথে বাংলা, ইংরেজি ও ফারসি ভাষায় দক্ষ। ১৮২৭ সালে ১৩ বছর বয়সে হিন্দু কলেজে স্কুল বিভাগে ভর্তি হন কিশোর প্যারিচাঁদ। ঐ কলেজের ইংরেজী সাহিত্য ও দর্শন শাস্ত্রের শিক্ষক এবংবিখ্যাত ইয়ং বেঙ্গল আন্দোলনের নেতা এইচ. এল. ভি. ডিরোজিও’র দৃষ্টি আকর্ষণ করেন আপন প্রতিভায় । কিশোর বয়স থেকেই একটি কুসংস্কার মুক্ত, আধুনিক, সুশিক্ষিত সমাজের স্বপ্ন দেখতেন প্যারিচাঁদ। সেই লক্ষ্যে, তিনি ছাত্র থাকা কালীন হিন্দু কলেজের আদর্শে, নিজের বাড়িতে একটি অবৈতনিক পাঠশালা খোলেন। এই অনুপ্রেরনা তাকে  একজন মুক্তমনা ও সমাজ সংস্কারক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে সাহায্য করেছিলো।

কর্মজীবনে তিনি ছিলেন কলকাতা পাবলিক লাইব্রেরীর গ্রন্থাগারিক। বইয়ের সান্নিধ্য বিভোর হয়ে থাকা প্যারীচাঁদ  চাকরি বদল করেননি। তবু তাঁর সত্যিকার পরিচয় একজন লেখক ও সমাজ সংস্কারক। তিনি ছিলেন ঊনবিংশ শতাব্দীর অন্যতম সমাজসচেতন গদ্য রচয়িতা। তিনি বিধবা বিবাহের সমর্থক এবং বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহের বিরোধী ছিলেন।

বাংলা উপন্যাস লেখার যে ধারাকে প্যারীচাঁদ মিত্র সৃষ্টি করেছিলেন তা-ই আজ বাংলা কথাসাহিত্যের সবচেয়ে আধুনিক ও সমৃদ্ধতম শাখা। বাংলা সাহিত্যের প্রথম উপন্যাস “আলালের ঘরে দুলাল” এ যে কথ্য ভাষা তিনি ব্যাবহার করেছিলেন, তা পরবর্তীতে ‘আলালি ভাষা’ নামে পরিচিতি পায়।

প্যারীচাঁদ মিত্রের লেখা উপন্যাস গুলোর মধ্যে- ‘আলালের ঘরের দুলাল’, ‘মদ খাওয়া বড় দায়’, ‘জাত থাকার কি উপায়’, ‘অভেদি’, ‘আধ্যাত্মিকা’, ‘The Zamindar and Ryots’ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

সেই শত বছর আগে, একটি আধুনিক সমাজ গঠনে প্যারীচাঁদ মিত্রের একনিষ্ঠতা নিঃসন্দেহে ব্যাতিক্রমী প্রয়াস। ১৮৮৩সালের ২৩ শে নভেম্বর এই আধুনিক মননের মানুষটি পৃথিবীর ওপারে যাত্রা করেন। আধুনিকতার প্রকাশ পোশাকে নয়, বরং তা প্রকাশ পায় মানুষের চিন্তায়, মানসিকতায়। তাইতো হাজার বছর পরেও, প্যারীচাঁদ মিত্র আধুনিক, অমলিন ও বরেণ্য।

Comments

comments