On Air
Flash Back Cafe
Home
  • Home
  • Rebel King of the Rock- বব ডিলান
bob-peoplesradio

Rebel King of the Rock- বব ডিলান

24 May 2016 Latest


প্রায় পাঁচ দশক ধরে আমেরিকার সঙ্গীত ও সাহিত্য জগতের অন্যতম জনপ্রিয় নাম বব ডিলান- তিনি ছিলেন একাধারে গায়ক, গীতিকার, লেখক, সুরকার, কবি এবং ডিস্ক জকি; যিনি পাঁচ দশক ধরে জনপ্রিয় ধারার সঙ্গীতের অন্যতম প্রধান ব্যক্তি হিসেবে সুপরিচিত। হয়ে আছেন জীবনমূখী গানের অন্যতম পথিকৃত। তখনকার জনপ্রিয় ধারার গানের বহির্ভুত ও বিপরীতমূখী গানের জন্ম দিয়ে বিখ্যাত হয়েছেন। মানুষের সৃষ্টিশীলতা কিভাবে মানুষকে তার সহজাত সব গুণের উর্ধ্বে নিয়ে যেতে পারে তার এক জ্বলন্ত সাক্ষ্য বব ডিলান। ‘একজন ভাল গায়ক হতে জন্মগত সুকন্ঠের অধিকারী হতেই হবে কিংবা ঐশ্বরিক গুণসম্পন্ন হতে হবে’- এমন সব ধারনাকে মিথ্যা প্রমাণ করে শীর্ষে আরোহন করেন। একই সাথে ফোক-রক, কান্ট্রি-রক দিয়ে নতুন ধারার সঙ্গীতের সূচনা করেন তিনি।

১৯৪১ সালের ২৪শে মে Minnesota-র Duluth শহরের ম্যারি হাসপাতালে জন্ম হয় এই মহান শিল্পীর। তখন তার নাম রাখা হয় Robert Allen Zimmerman। ছয় বছর বয়স পর্যন্ত Duluth শহরেই ছিলেন। তার বাবার পোলিও হলে ডিলান মায়ের বাসায় Hibbing এ চলে আসেন। এরপর বড় হন Minnesota-রএই Hibbing শহরে সুপারিয়র লেকের পশ্চিমে Mesabi Iron range-এ।

ডিলানের দাদা-দাদী জিগম্যান ও আনা জিমারম্যানইউক্রেনের ওডেসা হয়ে ১৯০৫ সালের দিকে আমেরিকায় বসতি স্থাপন করেছিলেন। তার মায়ের দাদা-দাদী বেঞ্জামিন ও লিব্বা এডেলস্টেইন ছিলেন লিথুয়ানীয় ইহুদী। তারা আমেরিকায় আসেন ১৯০২ সালের দিকে। তার পিতামাতা অ্যাব্রাম জিমারম্যান ও বেয়াট্রিস “বেটি” স্টোন ছিলেন এলাকার ছোট্ট ইহুদি সমাজের সদস্য। সাত বছর বয়স পর্যন্ত জিমারম্যান ডুলুথে বাস করেছেন। তার পিতা পোলিওতে আক্রান্ত হলে তার পরিবার হিবিং এলাকায় স্থানান্তরিত হয়, যেখানে জিমারম্যান তার শৈশবের বাকী দিনগুলো কাটিয়েছেন। ববের ছোটবেলার বন্ধু অ্যাব্রামের বর্ণনায় বলেছেন তিনি ছিলেন কঠোর স্বভাবের ও রূঢ়। কিন্তু ডিলনের মা ছিলেন কোমল ও বন্ধুত্বপূর্ণ স্বভাবের।

ডিলানের শৈশবে একটা বড় সময় কাটাতেন রেডিও শুনে। প্রথমত তিনি শুনতেন ব্লুজ ও কান্ট্রি গান যা প্রচারিত হত শ্রেভেপোর্ট থেকে। পরবর্তীকালে তিনি প্রথম দিককার রক অ্যান্ড রোল সঙ্গীতের দিকে ঝুঁকে পড়েন। উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময়ে তিনি কয়েকটি ব্যান্ড গঠন করেছিলেন। প্রথম ব্যান্ড “দ্য শ্যাডো ব্লাস্টার্স” বেশিদিন টেকেনি। পরবর্তী ব্যান্ড “দ্য গোল্ডেন কর্ডস” কিছুদিন টিকেছিল। বিদ্যালয়ের প্রতিভা বিকাশ প্রতিযোগিতায় তারা “ড্যানি অ্যান্ড দ্য জুনিয়র্সের” ‘রক অ্যান্ড রোল ইজ হেয়ার টু স্টে’ গানটি এত জোরে গেয়েছিলেন যে উপস্থিত দর্শকদের উত্তেজনা ঠেকাতে বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ মাইক্রোফোন বন্ধ করে দিয়েছিলেন। এ সময়েই Rock and Roll গানের প্রতি তার আগ্রহ তৈরি হয়। Hibbing High School- এ পড়া অবস্থায় বিভিন্ন ব্যান্ডের সাথে গান গেয়েছেন। এই সময়ে Golden Chords-এ little Richard এবং Elvis Presley-র গানও গেয়ে শোনান। ১৯৫৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জিমারম্যান ইউনিভার্সিটি অব মিনেসোটা তে ভর্তি হন এবং মিনিয়াপোলিসে বসবাস শুরু করেন। রক অ্যান্ড রোলে তার প্রথমদিককার উৎসাহ থেকে তিনি আমেরিকান ফোক সঙ্গীতে, বিশেষত যেসব সঙ্গীতে অ্যাকুস্টিক গিটার ব্যবহৃত হয় তা প্রতি আকৃষ্ট হন। একই বছরে ডিলান Elston Gunnn নামে আরো ২টি অনুষ্ঠান করেন এবং পিয়ানো বাজান। এভাবেই সঙ্গীতের জগতে তাঁর পদচারণা শুরু হয়।

১৯৬০ সালের মে মাসে বব ডিলানকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিস্কার করা হয়। ১৯৬১ সালে ডিলান New York City ভ্রমনে বের হন। ফেব্রুয়ারি, ১৯৬১ সালের দিকে ডিলান Greenwich village এ আসেন এবং এখানকার বিভিন্ন লোক শিল্পীদের সাথে যুক্ত হন (Dave Van Ronk, Fred Neil, Odetta, the New Lost City Ramblers, and Irish musicians The Clancy Brothers and Tommy Makem.) তিনি ধীরে ধীরে লোক পরিচিতি পেতে শুরু করেন। লোক শিল্পী Carolyn hester এর একটি অ্যালবামে ডিলান হারমোনিকা বাজান। তার অসাধারণ হারমোনিকা বাজানোর গুণটি তখন John Hammond এর নজরে পরে। তিনি ডিলানকে কলাম্বিয়ান রেকর্ড করান প্রস্তাব করেন এবং মার্চ ১৯৬২তে ডিলানের প্রথম কলাম্বিয়ান অ্যালবাম প্রকাশ পায়। প্রথম অ্যালবামটি সামান্য সাড়া ফেলে এবং প্রায় ৫০০০ কপি বিক্রি হয় প্রথম বছরে। এই অ্যালবামে ডিলানের নিজস্ব দু’টি গান ছিল মাত্র। এরপরের অ্যালবামের জন্য ডিলান তাই নিজে সব গান লেখার চেষ্টা করেন। তাঁর দ্বিতীয় অ্যালবাম The Freewheelin’ Bob Dylan প্রকাশ পেলে তা আমেরিকায় ব্যাপক সাড়া ফেলে দেয়। বিভিন্ন শিল্পী এই অ্যালবামের গানগুলো পরিবেশন করতে শুরু করেন। এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি স্মরণীয় Peter, Paul এবং Mary । Blowin’ in the Wind” এই গানটি সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা পায় এবং ‘বব ডিলান’ মানুষের কাছে একটি পরিচিত নাম হয়ে ওঠে। এরপর ১৯৬৩ সালে জনপ্রিয় লোকশিল্পী Joan Baez ববডিলানের Freewheelin’এর গানগুলোর প্রচারনা শুরু করলে অ্যালবামটি জনপ্রিয় ১০০ অ্যালবামের ২৩ নম্বরে চলে আসে। এই সময়ে Joan Baez এবং bob Dylan ভালবাসার এক মধুর সম্পর্ক তৈরি হয়। Joan baez ডিলানের গানগুলোই পরিবেশন করতে শুরু করেন এবং বব ডিলান খুব দ্রুত নতুন নতুন গান লিখতে থাকেন।

১৯৬৪ সালে The Times They Are A-Changin’ অ্যালবামটি প্রকাশিত হয়। এ অ্যালবামের গানগুলো নিউ ইয়র্কের সমসাময়িক সব গায়কদের ছাড়িয়ে যায়। এই অ্যালবামের গানগুলোর কথায় John Keats এবং Rimbaud এর বিভিন্ন রচনার ছাপ পাওয়া যায়। এই সময়ে ডিলান তার গানগুলোতে লোক সঙ্গীতের সাধারণ সীমা ছাড়িয়ে R&B এবং blues-এর মিশ্রন তৈরি করেন। ১৯৬৪ সালে প্রকাশ পাওয়া Another Side Of Bob Dylan-অ্যালবামে এরকম মিশ্র গানগুলো পাওয়া যায়। ব্রিটিশ ব্যান্ড the Animals’ এর ‘হাউজ অফ দ্যা রাইসিং সান’ ভার্সন থেকে অনুপ্রেরনা পেয়ে ডিলান loud rock & roll বব ডিলান তার পরবর্তী অ্যালবামটি তৈরি করেন। যদিও ১৯৬৫ সালে প্রকাশিত Bringing It All Back Home অ্যালবামে অ্যাকুস্টিক বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করা হয়। এই অ্যালবামটি পরিস্কারভাবে ফোক সঙ্গীতে ডিলানের প্রত্যাবর্তনকে ইঙ্গিত করে। Newport folk উতসবে the Paul Butterfield Blues Band-সাথে গান গেয়ে লোকশ্রোতাদের কাছে তাদের পরিচিত ডিলান হিসেবে ফিরে আসেন। যদিও ততদিনে ডিলান হয়ে উঠেছেন rock & roll সংঘের একটি প্রিয় নাম।

ডিলান ১৯৬৫ সালে পপশ্রোতাদের জন্য নিয়ে আসেন এক নতুন চমক, নতুন অ্যালবাম ‘Like a Rolling Stone’ । এটি প্রথম বছরেই অর্জন করে দ্বিতীয় শীর্ষস্থান। এই অ্যালবামটি দিয়েই আলোচনার শীর্ষে উঠে আসেন বব ডিলান। এই অ্যালবামের গানের কথাগুলো সাহিত্যানুরাগীদের গবেষণার বিষয়বস্তু হয়ে উঠে। ইউরোপ-আমেরিকার প্রায় ১০০ শিল্পী ১৯৬৪-১৯৬৬ সাল পর্যন্ত শ্রোতাদের তার গানগুলো পরিবেশন করে শোনান। the Byrds এবং the Turtlesব্যান্ডগুলো জনপ্রিয় হয়ে উঠে ১৯৬৫ সালে প্রকাশিত ডিলানেরHighway 61 Revisited অ্যালবামের গানগুলো দিয়ে। ১৯৬৫-৬৬ সালে প্রকাশিত ‘PositivelY 4thStreet এবং ‘Rainy Day Women’ স্থান পায় শীর্ষ দশে। ১৯৬৬ সালের মে মাসে তাঁর প্রথম দ্বৈত অ্যালবামBlonde on Blonde প্রকাশ পায় এবং পুরো পৃথিবীতে এর ১ কোটিরও বেশি কপি বিক্রি হয়।

১৯৬৫ সালে বব ডিলানের সাতে ব্যাকিং ব্যান্ড হিসেবে The Hawks এর উপস্থিতি দেখা যায়। এটি ডিলানের ব্যাকিং ব্যান্ডগুলোর মধ্যে এটিই সবচেয়ে বিখ্যাত। ব্যান্ডের মধ্যকার সংহতি আর ইউরোপ ভ্রমনে ডিলানের সাথে সহকারী বাদক হিসেবে সঙ্গীত পরিবেশনই তাদের জনপ্রিয় করে তোলে। the Hawks পরবর্তীতে (১৯৬৮ সালে) তাদের নাম পরিবর্তন করে হয় the Band । ১৯৬৬ সালে ইউরোপ ভ্রমণে ডিলান ইলেট্রিক গিটার নিয়ে হাজির হন শ্রোতাদের কাছে। ইউরোপীয় শ্রোতাগণ প্রথমবারের মত পান ‘ইলেট্রিক ডিলান’কে। যদিও তারা এটিকে সহজভাবে গ্রহন করেনি। Manchester Concert এর এক শ্রোতা এ সম্পর্কে ডিলানকে “Judas” inspiring a positively vicious version of “Like a Rolling Stone” বলেন. ইউরোপ সফর শেষ হলে ডিলান আবার আমেরিকায় ফিরে আসেন।

১৯৬৬ সালের ২৯শে জুলাই Woodstock-এ ডিলানের বাড়ির সামনে তার একটি মোটরবাইকে্র সাথে ধাক্কায় তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন। এই দূর্ঘটনায় তিনি সপ্তাহখানেক সকটাপন্ন অবস্থায় থাকেন। বেশ কিছু জীবনীকথক এই দূর্ঘটনার মাত্রা সম্পর্কে পড়ে প্রশ্ন তোলেন। তবে এই দূর্ঘটনা ডিলানের জীবনের একটি বড় পরিবর্তন আনে। এরপরে বেশ কিছু মাসের জন্য ডিলান নিজ বাড়িতে নিজের পরিবারের সাথে সঙ্গীতজগতের বাইরে খানিকটা অবরুদ্ধ জীবনযাপন করেন। কিছু মাস পরে সহকারী বাদক ব্যান্ড The Band –এর তিনি নতুন রেকর্ডের কাজ শুরু করেন। এবার ডিলান তার গানে এক অবিস্মরণীয় পরিবর্তন আনেন। কিছু পুরনো ফোক, কান্ট্রি এবং ব্লুজ গানের মিশ্রণে তৈরি করেন নতুন ধারার সঙ্গীত। এই গানগুলোতে rock & roll এর প্রভাব খুব কম চোখে পড়ে। প্রথমবারের মত এই গানগুলো ষাটের দশকে বুকলেট হিসেবে পাওয়া যায়। এর কিছু পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালে ডিলানের দ্বৈত অ্যালবাম The Basement Tapes –এ যুক্ত হয়।

১৯৬৭ সালে রক সঙ্গীতে খ্যাত ডিলান যখন শান্ত কান্ট্রি-রক সঙ্গীতের উপর ভিত্তি করে তৈরি John Wesley Hardingঅ্যালবাম নিয়ে হাজির হলেন শ্রোতাদের কাছে শ্রোতারা দীর্ঘবিরতির পর ডিলানের এই নতুন ধারার সঙ্গীতে অনেক বেশি অভিভূত হয়। এ অ্যালবামটিও জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠে।

ডিলান তার পরবর্তী Nashville Skylineঅ্যালবামেও কান্ট্রি সঙ্গীতের ধারা ধরে রাখেন। এই অ্যালবামের কিছু গানে শিল্প-কারখানার মালিকদের সমালোচনা করা হয়। এরপর একইরকম দ্বৈত আবহে Self Portrait অ্যালবামটিও প্রকাশিত হয়।

New Morningঅ্যালবামটি প্রকাশিত হবার পর ডিলান Greenwich village এ ফিরে আসেন। অবশেষে ১৯৭০ সালের নভেম্বরে Tarantula প্রকাশিত হয় এবং ১৯৭১ সালের আগস্টে তিনি যুদ্ধবিদ্ধস্ত বাংলাদেশের সাহায্যের জন্য Concert for Bangladesh- এর আয়োজন করেন। ১৯৭২ সালে তিনি অভিনয়ে যোগ দেন। ১৯৭৩ সালে প্রকাশিত Alias in Sam Peckinpah’sPat Garrett and Billy the Kid-এ অভিনয়ের পাশাপাশি চলচ্চিত্রটির জন্য বিভিন্ন গানের কাজও করেন ডিলান। ১৯৭৪ সালে আরও দু’টি অ্যালবাম প্রকাশ পায়। এর মধ্যে Planet Waves অ্যালবামটি rock & roll গানের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা পায়। এর পরবর্তীতে বব ডিলান আরো বেশ কয়েকটি অ্যালবামের কাজ করেন। ডিলানের সব স্টুডিও ও একক অ্যালবামের তালিকা পরবর্তী অংশে দেয়া হয়েছে।

১৯৭৭ সালের ২৯শে জুন Sara Lownds এর সাথে বব ডিলানের বিচ্ছেদ ঘটে। ডিলান- সারার চার সন্তানের মধ্যে Jakob Luke পরবর্তীতে The Wallflowers ব্যান্ডের গায়ক এবং একই সাথে সফল ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিতি পান। সারার সন্তান Maria Lownds গীতিকার Peter Himmelman কে বিয়ে করেন। ১৯৮৬ সালে ডিলান তার সহশিল্পী Carolyn Dennis কে বিয়ে করেন। তাদের বিচ্ছেদ ঘটে ১৯৯২ সালে। ক্যারোলিন ও ডিলানের সন্তান Desiree Gabrielle Dennis-Dylan জন্ম হয় ১৯৮৬ সালে। তবে তাদের এ সন্তানের ব্যাপারে জানা যায় অনেক পরে_ ২০০১ সালে, Howard Sounes‘ এর Dylan biography, Down the Highway: The Life Of Bob Dylan থেকে।

৯০’এর দশকের দিকে ডিলান লাইভ কনসার্ট, স্টুডিও এবং আঁকাআকি নিয়ে কাটিয়েছেন। তিনি ১৯৯২ সালে আবার আকুস্টিক বাদ্যযন্ত্র নিয়ে Good as I Been to Youঅ্যালবামটি প্রকাশ করেন। ১৯৯৪ সালে ডিলানের আঁকা ছবির ৬টি বই প্রকাশ পায় এবং আর্ট গ্যালারীতে এগুলোর প্রদর্শনীও হয়।

ডিলানের প্রথমদিককার গানের কথা ছিল মূলত রাজনীতি, সমাজ, দর্শন ও সাহিত্যিক প্রভাব সম্বলিত। এগুলো তখনকার জনপ্রিয় ধারার কথিত নিয়ম বহির্ভূত ছিল এবং এ ধারার বিপরীত হিসেবে ধরা হত। নিজস্ব সঙ্গীত ধারা প্রসারের পাশাপাশি তিনি আমেরিকার বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী সঙ্গীতের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করতেন। তিনি আমেরিকান লোকগীতি ও কান্ট্রি/ব্লুজ থেকে শুরু করে রক অ্যান্ড রোল, ইংরেজ, স্কটিশ, আইরিশ লোকগীতি, এমনকি জ্যাজ সঙ্গীত, সুইং, ব্রডওয়ে, হার্ডরক এবং গসপেলও গেয়েছেন।

ডিলন সাধারণত গিটার, কিবোর্ড এবং হারমোনিকা বাজিয়ে গান করেন। ১৯৮০ দশক থেকে কিছু সংগীতজ্ঞকে সাথে নিয়ে তিনি নিয়মিত বিভিন্ন দেশে সঙ্গীত ভ্রমণ করে ছিলেন, যা তার ভাষায়- “নেভার এন্ডিং ট্যুর”। তিনি প্রধান অনেক শিল্পীর সাথে একত্রে কাজ করেছেন, যেমন- দ্য ব্যান্ড, টম পেটি, জোয়ান বায়েজ, জর্জ হ্যারিসন, দ্য গ্রেটফুল ডেড,জনি ক্যাশ, উইলি নেলসন, পল সিমন, এরিক ক্ল্যাপটন, প্যাটি স্মিথ, ইউ২, দ্য রোলিং স্টোনস, জনি মিচেল, জ্যাক হোয়াইট, মার্লে হ্যাগার্ড, নেইল ইয়ং, ভ্যান মরিসন, রিঙ্গো স্টার এবং স্টিভি নিকস।

১৯৬২ সালের ১৯ মার্চ কলম্বিয়া রেকর্ডস কর্তৃক প্রকাশিত হয় তার প্রথম স্টুডিও অ্যালবাম। মূলত এই অ্যালবামের মাধ্যমেই বব ডিলান সংঙ্গীত শিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। অ্যালবামটি প্রযোজনা করেছেন জন এইস. হেমান্ড। এই অ্যালবামে ফোক গানের পাশাপাশি দুটি মৌলিক গানও রয়েছে। মৌলিক গান দুটি হলো, “টকিন নিউইয়র্ক” এবং “সং টু উডি”।

ডিলানের শ্রেষ্ঠ কাজের মধ্যে অনেকগুলো ১৯৬০ দশকে রচিত হয়েছে। এসময় তিনি অ্যামেরিকান অস্থিরতার প্রতীক বিবেচিত হতেন। তার কিছু গান, যেমন “Blowin’ in the Wind” and “The Times They Are a-Changing'”, যুদ্ধবিরোধী জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে জনপ্রিয়তা পেয়েছে এবং ১৯৫৫-১৯৬৮ সালের আমেরিকান নাগরিক অধিকার আন্দোলনের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। তার সর্বশেষ অ্যালবা‍ম, Christmas In The Heart ২০০৯ তে মুক্তি পেয়েছে । রোলিং স্টোন ম্যাগাজিন একে পরবর্তীতে বর্ষসেরা অ্যালবাম হিসেবে সম্মানিত করেছে।

নিজের পুনঃনামকরণ নিয়ে তার আত্মজীবনী “ক্রনিকলস” তে তিনি লিখেছেনঃ “বাড়ি থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর আমি নিজেকে রবার্ট অ্যালেন নামে ডাকতে শুরু করলাম। এটা শুনলে মনে হত কোন স্কটিশ রাজার নাম এবং এটা আমি পছন্দ করতাম”। কিন্তু পরবর্তীতে ডাউনবিট ম্যাগাজিন পড়ে তিনি জানতে পারেন ডেভিড অ্যালিন নামে বাস্তবে একজন স্যাক্সোফোন বাদক রয়েছে। এ সময় ডিলান থমাসের কবিতার সাথে তার পরিচয় ঘটে। রবার্ট জিমারম্যান অনুভব করছিলেন রবার্ট অ্যালিন ও রবার্ট ডিলান থেকে তাকে একটাকে বেছে নিতে হবে। শেষ পর্যন্ত ডিলনাই তার পছন্দ হয়। তিনি নামের আগে বব যোগ করার সিদ্ধান্ত নেন, কেননা তখন জনপ্রিয় ধারার অনেক শিল্পীর নামেই বব ছিল।

যদিও তিনি গায়ক হিসেবেই তিনি বেশি পরিচিত এবং সফল হয়েছেন, তবে গীতিকার হিসেবেই তার অবদানকে বেশি মূল্য দেয়া হয়। তার রেকর্ডের অর্জন হিসেবে তিনি গ্রামি এ্যাডওয়ার্ড, গোল্ডেন গ্লোব এবং অ্যাকাডেমি পুরস্কার জিতেছেন এবং রক অ্যান্ড রোল হল অব ফেম, ন্যাশভিল সং রাইটার্স হল অব ফেম, সং রাইটার্স হল অব ফেম এ তার নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। টাইম ম্যাগাজিনের প্রকাশিত বিংশ শতকের শ্রেষ্ঠ ১০০ প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকায় তার নাম রয়েছে। ২০০৪ সালেরোলিং স্টোন ম্যাগাজিন প্রকাশিত সর্বকালের শ্রেষ্ঠ ১০০ গায়ক তালিকায় দ্য বিটলসের পর বব ডিলান দ্বিতীয় অবস্থান দখল করেছেন। ১৯৯০ সালের জানুয়ারিতে ডিলানকে ফরাসি সংস্কৃতি মন্ত্রী জ্যাক ল্যাং কর্তৃক কমান্ডার দেস আর্টস এট দেস লেটার্স উপাধিতে ভুষিত করা হয়; ২০০০ সালে রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অব মিউজিক তাকে পোলার মিউজিক পুরস্কার প্রদান করে এবং ২০০৭ সালে ডিলানকে সংস্কৃতিতে প্রিন্স অব অস্ট্রিয়াস পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে। তিনি কয়েকবার নোবেল সাহিত্য পুরস্কার এর জন্য মনোনীত হয়েছেন।

২০১২ তে হোয়াইট হাউসে ডিলান প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ২০১৫ সালের ২৯ মে হোয়াইট হাউসের এক অনুষ্ঠানে বব ডিলানকে আমেরিকার সর্বোচ্চ বেসামরিক উপাধি “প্রেসিডেন্টশিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম” পদক পরিয়ে দেন। কালো রোদচশমা পরিহিত ডিলানের গলায় পদক পরিয়ে দিয়ে বারাক ওবামা বলেন, ‘আমেরিকার সংগীতের ইতিহাসে তার মতো মহীরূহতুল্য ব্যক্তিত্ব আর দ্বিতীয় কেউ নেই।’ উচ্ছ্বসিত প্রেসিডেন্ট স্বীকার করেন, ‘আমাকেও বলতে হবে, আমিও তার একজন ভক্ত।’

৭৫ বছর বয়সী বব ডিলান ছয়শ-র ও বেশি গানের রচয়িতা এবং ১১ বার গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড বিজয়ী। সরকারি বর্ণনায় তাঁকে উল্লেখ করা হয় ‘বিশ শতকের আধুনিক সংগীতের সবচেয়ে প্রভাবশালী শিল্পী’ হিসেবে। বব ডিলানের সঙ্গে ঔপন্যাসিক টনি মরিসন ছাড়াও প্রেসিডেন্ট ওবামা আরও যাদের এই পুরস্কার দেন তারা হলেন: নভোচারী ও সাবেক সিনেটর জন গ্লেন, সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি জন পল স্টিভেনস, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেডিলিন অলব্রাইট, ইসরাইলের সাবেক রাষ্ট্রপতি শিমন পেরেজ ও ইয়ান কারস্কি, পোলান্ডে নাৎসি হত্যাযজ্ঞের নির্মম ইতিহাস যিনি প্রথম জনসমক্ষে বর্ণনা করেন। অনুষ্ঠানে শিমন পেরেজ অনুপস্থিত ছিলেন। হোয়াইট হাউসের এক ঘোষণায় বলা হয়, পরে আলাদাভাবে পেরেজকে পদক প্রদান করা হবে। এই পুরস্কারের জন্য প্রেসিডেন্ট নিজেই প্রার্থীদের মনোনয়ন দিয়ে থাকেন। অতীতে এই পুরস্কার পান হেনরি কিসিঞ্জার, নেলসন মেন্ডেলা ও মার্টিন লুথার কিং।

দ্য বেস্ট অফ বব ডিলান বব ডিলানের জনপ্রিয় গান সংবলিত একটি একক অ্যালবাম। অ্যালবামটি ১৫ নভেম্বর, ২০০৫ সালে প্রকাশিত হয়। দ্য বেস্ট অফ বব ডিলান অ্যালবামটি ডিজিপ্যাক ফরমেটে পাওয়া যায়। এই অ্যালবামে গানের সাথে প্রত্যেক গানের উপর বিবরণ দেয়া আছে। যে গানগুলো সেখানে রয়েছে, সেগুলো হলো-

  • “ব্লোইন’ ইন দ্য উইন্ড”
  • “দ্য টাইমস দে আর অ্য চেন্জেইন’
  •  “মি. তেমবোরিন ম্যান”
  • “লাইক অ্য রোলিং স্টোন”
  •  “রেইনি ডে”
  •  “অল এলোং দ্য ওয়াচটাওয়ার”
  •  “লে, লেডি, লে”
  •  “নকিং অন হেভেন’স ডোর”
  • “টেংলেড আপ ইন ব্লো”
  • “হারিকেন”
  • “ফরইভার ইয়ং”
  • “গটা সার্ভ সামবডি”
  • “ইনফিডেল্স”
  • “নট ডার্ক ইয়েট”
  • “থিংস হ্যাভ চেন্জড”
  • “সামার ডেস”

বব ডিলান সংগীতের এক অবিসংবাদিত নাম। ২০১৪ সালে তার সর্বশেষ অ্যালবাম Full Moon and Empty Arms প্রকাশ

একজন সফল সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে ডিলান ১০ কোটিরও বেশি রেকর্ড বিক্রি করেছেন। কালের শ্রেষ্ট ১০০ শিল্পীদের মধ্যে বব ডিলানের নাম সবসময়ই সমুজ্জ্বল থাকবে। ডিলানের গানগুলো একাধারে সাহিত্য, সমাজ, রাজনীতি এবং দর্শনকে প্রভাবিত করেছে। ডিলানের আমেরিকান সামরিক অধিকারের পক্ষে এবং যুদ্ধবিরোধী রক-কান্ট্রি সঙ্গীতগুলো মানুষের হৃদয়ে অনুরণিত হয়েছে বারবার। ডিলানের গানগুলো সূচনা করেছে নতুন ধারার সঙ্গীতের।

তিনি আমাদের হূদয়েও বিশেষভাবে স্থান করে আছেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধকালে তাঁর সহমর্মী অবদানের জন্য। জর্জ হ্যারিসন, জোয়ান বায়েজ আর বব ডিলান—এই নামগুলো বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানের নিরীহ, নিরস্ত্র জনগণের ওপর নির্বিচারে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার খবর জানার পর থেকেই কিছু একটা করার তীব্র তাগিদ থেকেই বিটলস খ্যাত জর্জ হ্যারিসন ও পণ্ডিত রবিশঙ্কর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের মানুষের সাহায্যার্থে আয়োজন করেছিলেন ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’। ১ আগস্টের এই কনসার্টে জর্জ হ্যারিসন যেমন ‘বাংলাদেশ’ গান লিখে ও গেয়ে বিখ্যাত হয়ে আছেন, তেমনি এই অনুষ্ঠানে আরেকজনের উপস্থিতি কনসার্টের গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছিল বহু গুণে। তিনি হলেন বব ডিলান। “কনসার্ট ফর বাংলাদেশে” বব ডিলান তাঁর বিখ্যাত ‘ব্লোইং ফর দ্য উইন্ড’ গানটি পরিবেশন করেছিলেন। এবং এই অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়েই দীর্ঘ আট বছর পর এটাই ছিল বব ডিলানের জনসমক্ষে প্রথম সংগীত পরিবেশনা। কবি অ্যালেন গিনসবার্গের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ অবলম্বন করে লেখা বিখ্যাত কবিতা ‘যশোর রোড’কেও গানে রূপান্তরের পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করেন বব ডিলান। বাংলাদেশের মানুষের দুঃখ-দুর্দশায় এ শিল্পীর অবদান আমরা তার অসামান্য কাজের মাধ্যমে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মামান্তরে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবো।

Comments

comments


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *